লাভ হচ্ছে কিন্তু পকেটে টাকা নেই? ক্যাশ-ফ্লো ম্যানেজমেন্ট গাইড ২০২৫
পুরান ঢাকার নবাবপুরের ইলেকট্রিক পার্টস ব্যবসায়ী আরমান সাহেব (ছদ্মনাম)। গত ঈদে তার বিক্রি বা সেলস ছিল রেকর্ড পরিমাণ। খাতাপত্রে হিসাব করে দেখলেন প্রায় ৫ লাখ টাকা নিট প্রফিট। আরমান সাহেব মহাখুশি। কিন্তু সমস্যা শুরু হলো পরের মাসের ১ তারিখে। দোকান ভাড়া, কর্মচারীর বেতন এবং ইমপোর্টারকে পেমেন্ট দিতে গিয়ে দেখলেন ক্যাশ বাক্সে টাকা নেই!
তিনি অবাক হলেন—”লাভ তো করলাম ৫ লাখ, তাহলে পকেটে টাকা নেই কেন?”
কারণ খুব সাধারণ—তার বিক্রির ৭০ শতাংশই ছিল বাকিতে (Credit Sales), আর বাকি টাকা দিয়ে তিনি অতিরিক্ত মালামাল স্টকে তুলেছেন যা এখনো বিক্রি হয়নি। আরমান সাহেবের এই অবস্থাকে অর্থনীতির ভাষায় বলা হয় “Cash Flow Crisis”।
বাংলাদেশে প্রায় ৬০% নতুন উদ্যোক্তা ব্যবসার প্রথম ৩ বছরের মধ্যে ঝরে পড়েন, এবং তার অন্যতম প্রধান কারণ পণ্য খারাপ হওয়া নয়, বরং হাতে নগদ টাকা না থাকা বা লিকুইডিটি সংকট (SME Foundation, 2024)।
আজ আমরা আলোচনা করব, ২০২৫ সালের এই প্রতিযোগিতামূলক বাজারে কীভাবে আপনি স্মার্ট ক্যাশ-ফ্লো ম্যানেজমেন্ট করে আপনার ব্যবসাকে টিকিয়ে রাখবেন এবং বড় করবেন।
ক্যাশ-ফ্লো কী? লাভের সাথে এর পার্থক্য কোথায়?
সহজ বাংলায়, ক্যাশ-ফ্লো হলো আপনার ব্যবসায় টাকার আসা (Inflow) এবং যাওয়া (Outflow)।
- লাভ (Profit): এটি একটি অ্যাকাউন্টিং টার্ম। আপনি ১০০ টাকার পণ্য ১২০ টাকায় বিক্রি করলেন (বাকিতে হলেও), আপনার ২০ টাকা লাভ।
- ক্যাশ-ফ্লো (Cash Flow): পণ্যটি বিক্রি করে আপনি নগদ কত টাকা হাতে পেলেন। যদি ১২০ টাকার পুরোটাই বাকি থাকে, তবে আপনার লাভ ২০ টাকা হলেও ক্যাশ-ফ্লো শূন্য বা নেগেটিভ (কারণ আপনি পণ্য কিনতে ১০০ টাকা খরচ করেছেন)।
মনে রাখবেন, “Revenue is Vanity, Profit is Sanity, but Cash is King.”
Getty Images
Explore
ছোট ব্যবসার ক্যাশ-ফ্লো ঠিক রাখার ৫টি পরীক্ষিত কৌশল
বাংলাদেশের বাজার ব্যবস্থা একটু ভিন্ন। এখানে বাকি ছাড়া ব্যবসা করা কঠিন। তবে নিচের কৌশলগুলো মেনে চললে আপনি ঝুঁকি কমিয়ে আনতে পারবেন।
১. বাকি আদায়ে স্মার্ট ও কঠোর হোন (Receivables Management)
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ‘বাকি’ ব্যবসার একটি অংশ। কিন্তু অনিয়ন্ত্রিত বাকি আপনার ব্যবসাকে ডুবিয়ে দিতে পারে।
- টার্মস ঠিক করুন: ইনভয়েসে স্পষ্ট করে লিখুন পেমেন্ট কত দিনের মধ্যে দিতে হবে (যেমন: Net 15 বা Net 30)।
- ইনসেনটিভ দিন: যারা নগদে বা সময়ের আগে পেমেন্ট দেবে, তাদের জন্য ২-৩% ছাড় বা ‘Early Bird Discount’ অফার করুন। এতে গ্রাহক দ্রুত টাকা দিতে উৎসাহী হবে।
- ফলো-আপ: পেমেন্ট ডেট পার হওয়ার সাথে সাথে রিমাইন্ডার দিন। লজ্জাবোধ করবেন না, এটি আপনার হক।
২. ইনভেন্টরি বা স্টকের দিকে নজর দিন
দোকান ভরা মাল থাকলেই ব্যবসা ভালো—এই ধারণা ভুল। যে পণ্য বিক্রি হতে ৬ মাস লাগে, তাতে টাকা আটকে রাখা মানে লস।
- Dead Stock চিহ্নিত করুন: গত ৩ মাসে যে পণ্যগুলো একবারও বিক্রি হয়নি, সেগুলো ডিসকাউন্টে বিক্রি করে ক্যাশ টাকা ঘরে তুলুন।
- Just-in-Time (JIT) পলিসি: পাইকারি বাজার কাছে থাকলে, খুব বেশি স্টক না করে প্রয়োজন অনুযায়ী মালামাল কিনুন।
৩. খরচের লাগাম টানুন (Expense Tracking)
অনেক সময় আমরা ব্যবসার টাকায় ব্যক্তিগত খরচ করে ফেলি বা অপ্রয়োজনীয় ডেকোরেশনে টাকা ঢালি।
- ব্যবসার অ্যাকাউন্ট এবং ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট সম্পূর্ণ আলাদা রাখুন।
- প্রতি মাসে ফিক্সড কস্ট (ভাড়া, বেতন) এবং ভেরিয়েবল কস্ট (বিদ্যুৎ, যাতায়াত) অডিট করুন। কোথায় খরচ কমানো সম্ভব তা খুঁজে বের করুন।
৪. ইমার্জেন্সি ফান্ড তৈরি করুন
করোনা মহামারী বা সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা আমাদের শিখিয়েছে যে, যেকোনো সময় ব্যবসা বন্ধ থাকতে পারে।
- লক্ষ্য রাখুন যেন অন্তত ৩ মাসের পরিচালন ব্যয় (Operating Cost) আপনার সেভিংস অ্যাকাউন্টে থাকে। এই টাকা ব্যবসার মূলধনের বাইরে।
৫. ডিজিটাল বুককিপিং ব্যবহার করুন
খাতায় কলমে হিসাব রাখার দিন শেষ। খাতা হারিয়ে যেতে পারে, হিসাব ভুল হতে পারে।
- টুলস: বাংলাদেশে এখন ‘Tally’, ‘HishabPati’ বা সাধারণ এক্সেল শিট ব্যবহার করে সহজেই দৈনিক ক্যাশ-ফ্লো ট্র্যাক করা যায়।
- Caplix-এর মতো প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হয়ে আপনি আপনার ব্যবসার আর্থিক স্বাস্থ্য নিয়মিত মনিটর করতে পারেন।
কেইস স্টাডি: একটি ই-কমার্স স্টার্টআপের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প
ধরা যাক, ঢাকার একটি অনলাইন গ্রোসারি শপ ‘ফ্রেশ বাস্কেট’ (কাল্পনিক নাম)। তাদের দৈনিক অর্ডার ছিল ২০০+। কিন্তু তাদের সমস্যা ছিল সাপ্লায়ারদের পেমেন্ট দিতে হতো নগদে, আর পেমেন্ট গেটওয়ে বা কুরিয়ার থেকে টাকা আসতো ৭-১০ দিন পর। ফলে মাঝখানের এই সময়ে তাদের হাতে টাকা থাকতো না।
তারা যা করলো: ১. তারা সাপ্লায়ারদের সাথে নেগোসিয়েশন করে পেমেন্ট টার্ম ৭ দিন পিছিয়ে নিলো। ২. কাস্টমারদের জন্য ‘বিকাশ/নগদ’-এ অগ্রিম পেমেন্টে ৫% ক্যাশব্যাক অফার চালু করলো। ৩. ফলে ক্যাশ অন ডেলিভারি (COD) কমে গেল এবং অগ্রিম টাকা আসায় তাদের ক্যাশ-ফ্লো পজিটিভ হলো।
ফলাফল: ৬ মাসের মধ্যে তাদের লিকুইডিটি সংকট কেটে গেল এবং তারা নতুন এরিয়াতে ডেলিভারি শুরু করলো।
বাংলাদেশে এসএমই লোন এবং ক্যাশ-ফ্লো সংকট
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্যমতে, এসএমই খাতে ঋণের প্রবাহ বাড়াতে ২০২৫ সালের জন্য ২৫,০০০ কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করা হয়েছে (Bangladesh Bank, SME Dept, 2024)। কিন্তু সমস্যা হলো, ব্যাংক লোন পেতে হলে আপনার ব্যবসার স্বচ্ছ ক্যাশ-ফ্লো স্টেটমেন্ট থাকতে হবে। ব্যাংক আপনার ‘লাভ’ দেখার আগে দেখবে আপনার ‘ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা’ বা নিয়মিত ক্যাশ ইনফ্লো আছে কিনা।
তাই, আজ থেকেই সঠিক হিসাব রাখা শুরু করুন। এটি শুধু ব্যবসার জন্য নয়, ভবিষ্যতে বড় বিনিয়োগ বা লোন পাওয়ার জন্যও জরুরি।
সিদ্ধান্ত
ব্যবসা মানে শুধু কেনা-বেচা নয়, ব্যবসা মানে ‘ম্যানেজমেন্ট’। লাভ কাগজ-কলমে থাকতে পারে, কিন্তু ক্যাশ বা নগদ টাকা হলো ব্যবসার অক্সিজেন। অক্সিজেন ছাড়া যেমন মানুষ বাঁচে না, পজিটিভ ক্যাশ-ফ্লো ছাড়া ব্যবসাও বাঁচে না।
আপনি যদি আপনার ব্যবসার আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে চিন্তিত হন বা বিনিয়োগ খুঁজছেন, তবে Caplix হতে পারে আপনার বিশ্বস্ত সঙ্গী। আমরা হালাল এবং স্বচ্ছ বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করে দিই।
